Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০২০, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ৫ রবি-উস-সানি ১৪৪২

এ এক ‘ভয়ঙ্কর’ আকবর

 প্রকাশিত: ১৫, অক্টোবর - ২০২০ - ১২:০১:৩৯ AM

 
এ এস রায়হান :: সিলেট নগরের প্রাণ কেন্দ্র বন্দর বাজারে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ঠিক পাশেই বন্দর বাজার পুলিশ ফাঁড়ি।
ব্যস্ত এলাকাটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল ফাঁড়ি স্থাপনের মূল্য উদ্দেশ্য। নিরাপত্তা নিশ্চিত দূরের কথা এই ফাঁড়িটি নগরবাসরি কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর পুলিশ সদস্যেদের জন্য এই ফাঁড়ি যেন টাকার খনি। সেখানে নিয়োগ পেলেই একেকজন পুলিশ সদস্য টাকার কুমির বনে যেতেন নিমিশেই। যেমনটি হয়েছেন এসআই আকবর।
বন্দর বাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে যোগ দেয়ার পরই যেন আলাদীনের প্রদীপ হাতে পেয়েছিলেন আকবর। দু-হাতে টাকা কামিয়েছেন।
সিলেট এবং নিজ গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গড়ে তুলেছেন অটেল সম্পদ। ফাঁড়িতে এনে নির্যাতন করে রায়হান হত্যার পর বেড়িয়ে আসছে আকবেরর নানা আপরাধের তথ্য। সিলেট নগরের বন্দরবাজার এলাকা ঘিরে ছিল এসআই আকবরের অপরাধ রাজ্য। হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, অসামাজিক কাজের জন্য হোটেল থেকে মাসোহারা, জুয়াড়ি, ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে অর্থ আদায়।
রাতে রাস্তা থেকে নিরীহ লোকজনদের ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে মাদক ও অবাঞ্ছিত নারীদের দিয়ে আটক দেখানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল এসআই আকবরের নিত্য দিনের ঘটনা। আকবর সম্পর্কে খোজ নিতে গিয়ে উঠে এসেছে ভয়ঙ্কর সব তথ্য। স্থানীয় একটি ইউটিউব চ্যানেলে নিয়মিত অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয় করা আকবরের ভেতরে ছিল তার সুন্দর চেহারার ঠিক উল্টো এক কুৎসিত রূপ। টাকার জন্য হেন কোন কাজ নেই যা তিনি করতেন না।
করোনা সংকট কাটাতে লকডাউনের পরবর্তি সময়ে সিলেটের বানিজ্যিক কেন্দ্রস্থল বন্দর বাজারের সিটি সুপার মার্কেট খুলতে চান ওই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা দেন বন্দর ফাড়ি ইনচার্জ আকবর। তিনি বলেন সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি মার্কেট খুলতে দিতে পারবেন না। তবে দোকান প্রতি যদি তাকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয় তাহলে সকাল ৬ টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত দোকান খুলতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা এমন প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে ক্ষোভে ফেটে পরেন আকবর। তিনি বলতে শুরু করেন লকডাউন পরেও এই মার্কেটে কাউকেই তিনি ব্যবসা করতে দেবেন না। তার কথা শুনে ক্ষুব্ধ হন ওই মার্কেটের ব্যবসায়ী কমিটির নেতৃবৃন্দরা। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারেন নি।
এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান “এ ধরনের পুলিশ অফিসার টাকার জন্য ভয়াবহ রকম লালায়িত যে এদের কাছে নীতির নুন্যতম চর্চা নেই। সিলেটি অফিসারদের যদি সিলেটে নিয়োগ দেওয়া হত তাহলে অন্তত তারা এত অমানবিক কাজ কর্ম করতে পারতেন না, সিলেটের বাইরে থেকে আসা পুলিশ সদস্যরা শাহজালালের পুন্যভুমিকে টাকা বানানোর চারনক্ষেত্র মনে করেন, যে কারনে যে কোন খারাপ কাজ করতে পিছপা হন না।
মহাজনপট্টির ব্যবসায়ীরা জানান, লকডাউনের সময় বাংলাদেশ পুলিশ যখন মানবিক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করে তখনো চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া ছিলেন এসআই আকবর। লকডাউনের সময় মহাজনপট্টিতে দোকান খুলতে হলে অনুমতি লাগত এসআই আকবরের। দোকানের এক শাটার খুললে ১ হাজার টাকা ও দুই শাটার খুললে ২ হাজার টাকা করে দিতে হতো তাকে। সিলেট নগরীর বন্দরবাজার এলাকা ঘিরে ছিল এসআই আকবরের অপরাধ রাজ্য। হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, অসামাজিক কাজের জন্য হোটেল থেকে মাসোহারা, জুয়াড়ি, ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে অর্থ আদায়। রাতে রাস্তা থেকে নিরীহ লোকজনদের ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে মাদক ও অবাঞ্ছিত নারীদের দিয়ে আটক দেখানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় ছিল এসআই আকবরের নিত্য দিনের ঘটনা।
আকবর স্থানীয় একটি ইউটিউবে চ্যানেলের নাটকে অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয় করতেন। সেখানে তার নীতি কথায় অবাক হতেন আকবরের হাতে নানা সময়ে নির্যাতিত মানুষজন। ছাত্রলীগের মদন মোহন কলেজ শাখার এক কর্মীর কাছে একটি বিষয়ে আপোস মীমাংসায় ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন আকবর ভুইয়া। চলমান এক মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত “আয়ু” হওয়ার সুবাদে তিনি এই অনৈতিক প্রস্তাব করেন। তবে বলেন এই টাকার খুব সামান্য অংশ তিনি পাবেন, পুলিশের উর্ধত্বন কর্মকর্তাদের নাম পদবী উলে­খ করে বলেন বাকি টাকা তাদেরকে দিতে হবে। তবে সিনিয়র এক নেতার কৌশলে আকবরকে প্রমান সহ উল্টো জালে ফেলা হয়। সংগ্রহ করা হয় তার ঘুষ দাবির অডিও রেকর্ড, আসামীর সাথে বসে কথা বলার সিসি ফুটেজ। সে যাত্রা ওই নেতার পায়ে ধরে ছাড়া পান অভিনেতা আকবর। তবে থেমে থাকেনি তার খারাপ কাজ। ভোরবেলা সিলেট শহরে পৌছানো যে কোন বয়সী নারী পুরুষ তার নেতৃত্বাধীন টিমের শিকার হতেন। ছিনতাইকারীদের না ধরে ভোর থেকেই ক্বীন ব্রিজ এলাকায় সিএনজি তল্লাশি করা, সিলেট আগত মানুষজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করাই ছিলো তাদের মুল কাজ। বিভিন্ন ভাবে হয়রানীর মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা তুলতো আকবর বাহিনী। সর্বশেষ নিরীহ যুবক রায়হানকে একই কায়দায় তুলে নিয়ে তার পরিবারের কাছে দশ হাজার টাকা দাবি করা হয়। না দেওয়ায় ফাড়ির মধ্যেই তাকে এমন ভাবে পেটানো হয় যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন রায়হান। এ ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে আছে পুরো সিলেট।
রায়হানের মৃত্যুর পর তাকে ছিনতাইকারী সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন এই এসআই আকবর। নগরীর কাস্টঘরে ছিনতাই করতে গিয়ে গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন তিনি। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ফুটেজে গণপিটুনির কোনো প্রমাণ মেলেনি। শুধু এ ঘটনা নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমেও আকবরকে নিয়ে হচ্ছে লেখালেখি। বেরিয়ে আসছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।
জানা গেছে, ফাঁড়িতে আটকে রেখে রায়হানকে নির্যাতনের সময় সে চিৎকার করছিল। নির্যাতন না করে মেরে না ফেলতে পুলিশ সদস্যদের অনুরোধ করছিল। পাশের কুদরত উল্লাহ বোর্র্ডিং এর ব্যবসায়ী হাসান আহমদ জানান, রাতে তিনি তার এক আত্মীয়কে ঢাকার বাসে তুলে দিতে কদমতলী টার্মিনালে যান। ফিরে আসার পর তিনি শুনতে পান ফাঁড়ির ভিতরে কেউ চিৎকার করছে। বলছে, ‘আমি চোর-ডাকাত না, আমাকে আর মেরো না।’ পরে তিনি সকালে জানতে পারেন আগের রাতে ফাঁড়িতে রায়হান উদ্দিনকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার ঘটনা।
কাজিরবাজার মাদ্রাসার শিক্ষক ফুয়াদ আদনান জানান, তার এক বন্ধুর একটি কাজের জন্য তিনি একবার ফাঁড়িতে গেলে এসআই আকবর তাদের নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে বসেন। কাজটি করে দেওয়ার জন্য তিনি ১ লাখ টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় এসআই আকবর তাকে ফোন করে হুমকি দেন। হুমকি পেয়ে তিনি স্ট্যাটাসটি মুছতে বাধ্য হন।
বন্দরবাজার ফাঁড়ির আওতাভুক্ত এলাকায় ৮০০-৯০০ ভাসমান হকার রাস্তা ও ফুটপাথে বসেন। প্রত্যেক হকারের কাছ থেকে প্রতিদিন ৫০-১০০ টাকা করে চাঁদা উঠাতেন এসআই আকবর। তার পক্ষে কনস্টেবল জিয়া এই চাঁদা তুলতেন। সম্প্রতি জিয়া শিবেরবাজার ফাঁড়িতে বদলি হয়েছেন। সুরমা মার্কেটের ২টি, মহাজনপট্টি ও কালিঘাটের ২টি ও জিন্দাবাজারের ২টি হোটেল থেকে মাসে ২০ হাজার টাকা করে মাসোহারা আদায় করতেন তিনি। এ ছাড়া কাস্টঘর, কিনব্রিজের নিচ ও কালিঘাট এলাকায় মাদক কারবারি ও জুয়াড়িদের (শিলং তীর) কাছ থেকে সপ্তাহ ভিত্তিতে টাকা আদায় করতেন আকবর। বন্দরবাজারকেন্দ্রিক একাধিক ছিনতাইকারী চক্রকেও শেল্টার দিতেন ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর।
এদিকে আকবর আর তার পরিবারের ব্যাপারে মুখ খুলতে শুরু করেছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, চাকরিতে যোগদানের পর এখন অঢেল সম্পদের মালিক আকবর। তার পরিবার নিয়েও আছে নানা বিতর্ক। যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ মানতে নারাজ আকবরের স্বজনরা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জের বগাইড় গ্রামে বরখাস্ত হওয়া এসআই আকবর হোসেনের একটি আলিশান বাড়ি রয়েছে। পুলিশে যোগদানের পরই যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান তিনি। অল্প দিনেই নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন প্রচুর সম্পদ-সম্পত্তি।
সিলেটে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় আকবরের সংশ্লিষ্টতার খবর এরই মধ্যে ছড়িয়েছে তার এলাকায়। এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। স্থানীয়রা জানান, আকবরের পুরো পরিবার এলাকায় বিতর্কিত। তার বাবা ধর্ষণ মামলার আসামি ছিলেন। কারাগারেও ছিলেন একমাস।
রায়হানের মৃত্যুর পর বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেনসহ চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রত্যাহার করা হয়েছে আরও তিনজনকে। রায়হানের মৃত্যুর জন্য আকবরসহ ফাঁড়িতে কর্মরত সদস্যদের দায়িত্বহীনতা দায়ী ছিল বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার। রায়হান হত্যার তদন্ত চলছে জানিয়ে সিলেট পুলিশেরএ মুখপাত্র বলেন, হত্যাকাণ্ডে আকবরের সংশ্লিষ্টতা থাকলে অবশ্যই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

আপনার মন্তব্য

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ

Top