Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১৮ জ্বিলক্বদ ১৪৪১

করোনা সংকট মোকাবেলায় সমবায় ভাবনা

-মোঃ আনহার মিয়া

 প্রকাশিত: ১৪, জুন - ২০২০ - ০৩:৫৯:১৫ PM

 
Image may contain: 1 person, text
 
করোনা আক্রান্ত কৃষি অর্থনীতি এবং দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী একটি পরীক্ষিত স্বীকৃত মাধ্যম হচ্ছে সমবায়। বর্তমানে অর্থনীতির প্রায় সব শাখায় সমবায় তার কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ ও ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে সমবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে আর্থিক ও সেবা খাতে নতুন কার্যক্রম গ্রহণ, বিদ্যমান কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন ও সময়োপযোগীকরণের মাধ্যমে সমবায় অধিদপ্তর বেশ কিছু মৌলিক লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখতে পারে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা আনয়ন, প্রশিক্ষণ ও সেবাপ্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন বিশেষত নারী উন্নয়নে সমবায় নিকট ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
পৃথিবীর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটির মতো। অন্যদিকে জাতিসংঘের হিসাব মতে, বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ সমবায়ের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ করে থাকে। তার মধ্যে কানাডা, জাপান ও নরওয়েতে প্রতি তিনজনে একজন সমবায়ী। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে প্রতি চারজনে একজন সরাসরি যুক্ত সমবায়ের সঙ্গে। জাপানে কৃষিকাজে নিয়োজিতদের ৯০ শতাংশ সমবায়ী। তাছাড়া গণচীন, ভারত ও মালয়েশিয়ার জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশ সমবায়ী। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট সমবায়ীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। মোটকথা, ধনী-গরিব সব দেশে সমবায় সমিতির সাফল্যগাথা নজিরবিহীন। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিবিদরা বিশ্বাস করেন একটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, পরিবেশের বিপর্যয় রোধকরণে অন্যতম পরীক্ষিত পদ্ধতি হচ্ছে সমবায়ী উদ্যোগ। এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন উদ্যোক্তা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান।
ব্রিটিশ শাসনামলে পাক-ভারত উপমহাদেশে জমিদার ও গ্রাম্য মহাজনদের শোষণ-নিপীড়নের হাত থেকে নিষ্পেষিত কৃষকদের রক্ষার উদ্দেশ্যে এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও দরিদ্রতা দূর করার লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে 'কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি অ্যাক্ট' জারির মাধ্যমে সমবায়ের যাত্রা শুরু হয়। কালের পরিক্রমায় এই সমবায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সমাদৃত হতে থাকে। এ দেশে সমবায়ের বয়স প্রায় ১১৬ বছর। ধীরে ধীরে সমবায়ের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার সমবায় সমিতি রয়েছে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ত্রয়োদশাংশ সরাসরি সমবায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হলে দেশ অচিরেই দারিদ্র্য মুক্ত হবে। সমবায়ের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে একত্রিত করে সমবায়ভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করা যায়। যেমন- গাভী পালন, দুগ্ধ উৎপাদন, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা পালন ও মোটাতাজাকরণ, হাঁস-মুরগি ও কোয়েল পাখি পালন, কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ, মৎস্য চাষ, লবণ চাষ, তাঁত ও কুটির শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করা কঠিন কোনো কাজ নয়। এছাড়া সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কলকারখানা স্থাপন করে দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।
আমাদের দেশের প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ১ কোটির বেশি লোক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছে। আর তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও গার্মেন্ট খাতের আয়ের মাধ্যমে এ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। করোনা পরবর্তী রেমিট্যান্স ও গার্মেন্ট সেক্টরের আয় কমে গেলে এ প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী হবে। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি চাকরি হারিয়ে দেশে চলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব প্রবাসীরা যদি দেশে চলে আসে তাহলে তাদেরকে উৎপাদনমুখী কৃষিক্ষেত্রে কাজে লাগানোর জন্য সমবায় হতে পারে অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সরকার এসব প্রবাসীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমবায় সমিতি গঠন করে ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদের লব্ধকৃত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে উন্নত বিশ্বের কৃষিব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করতে পারে। এতে সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং খাদ্য আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে। বীজ ও সার বিতরণে সরকারকে নানা ঝামেলা পোহাতে হবে। সরকারের উচিত এই সার ও বীজ বিতরণে নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সহায়তা গ্রহণ করা। সমবায় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যারা কার্যকর সমবায় প্রতিষ্ঠান আছে তাদের মাধ্যমে এ কঠিন কাজটি করা অনেক সহজ হবে। এ কঠিন কাজটি আরও সহজ করার জন্য যৌথভাব কৃষি মন্ত্রণালয়, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। তাতে সরকারের যে খাদ্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা তা সহজে অর্জন সম্ভব হবে এবং আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার ধান উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এমনিভাবে বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী যেমন- গম, ভুট্টা, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী যেগুলো আমরা এখন আমদানির মাধ্যমে আমাদের চাহিদা পূরণ করে থাকি তা যদি এসব সমবায় সমিতির মাধ্যমে উৎপাদন করতে পারি তাহলে আমাদের আমদানি ব্যয় কমবে এবং আমাদের খাদ্য ঘাটতি রোধ করতে সহায়তা প্রদান করবে। এছাড়া দেশের মোট আবাদযোগ্য ৮৫.৭৭ লাখ হেক্টর জমির খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দেশের ৪৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়নভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনমুখী সমবায় সমিতি গঠন করে তাদের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তির কৃষি উপকরণ বিতরণ ও সহজশর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করলে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন সমস্যা সহজে সমাধান করা যাবে। ওইসব সমবায় সমিতিগুলোর মালিকানায় থাকবে ওই ইউনিয়নের সব ভোটার। এতে সেই ইউনিয়নের আয়-বৈষম্য দূর করা সহজ হবে। আর এ কাজটি সঠিকভাবে করতে না পারলে করোনাপরবর্তী খাদ্য সমস্যা দূর করা সরকারের জন্য কঠিন হবে। এছাড়া সরকারের ঘোষিত বিভিন্ন সহায়তা এসব সমবায় সমিতির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা গেলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ করা যাবে।
আশির দশকের শুরুর দিকে এ ধরনের দ্বি-স্তর সমবায়ের ব্যাপক সম্প্র্রসারণ ঘটলেও বিংশ শতকের শুরুর দিকে সমবায়ের এ ধারাটিও মুখ থুবড়ে পড়ে। সমবায় সেক্টরে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হলেও জাতীয়ভাবে টেকসই গ্রাম উন্নয়নের কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করা আবশ্যক। অথচ বিশ্বব্যাপী সমবায় একটি স্বীকৃত উন্নয়ন কৌশল। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যাপক সফলতা অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের ১৩(খ) অনুচ্ছেদে সম্পদের মালিকানার অন্যতম খাত হিসেবে সমবায়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েই সমবায়কে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে এবং শোষিত মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সমতাভিত্তিক উন্নয়ন দর্শনের আওতায় সমবায়কে অন্যতম কৌশলিক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে গ্রাম উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে সমবায়কে বেছে নেওয়া হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩ অনুসারে রাষ্ট্রে উৎপাদনযন্ত্র উৎপাদনব্যবস্থা ও বণ্টন প্রণালিগুলোর মালিক জনগণ। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায় মালিকানা ও ব্যক্তিগত মালিকানা- এ তিন ধরনের মালিকানাব্যবস্থা সংবিধানে স্বীকৃত। সমবায়ী মালিকানা হচ্ছে আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমবায়গুলোর সদস্যদের পক্ষে সমবায়গুলোর মালিকানা, যা সমষ্টিগত বা যৌথ মালিকানা। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব মেহনতী মানুষকে, কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগণের অনগ্রসর অংশগুলোকে সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তিদান করা। এ ক্ষেত্রে সমবায়ব্যবস্থা বড় ভূমিকা পালন করতে পারে, কেননা সমবায়, সমবেত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সবার দ্বারা দুর্বলকে শোষণ থেকে মুক্ত করে তার ক্ষমতায়নে সহায়তা করে। যুগোপযোগী সমবায় নীতির আওতায় বিকশিত সমবায়ের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে সামাজিক সাম্য ও সমতা অর্জনসহ মালিকানা সম্পর্কিত সাংবিধানিক স্বীকৃতির সফল রূপায়ণ সম্ভব। দেশের সমৃদ্ধ ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও এর উপযোগিতা বৃদ্ধি, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, উৎপাদিত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে সমবায় প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এসব উদ্দেশ্য এবং সমবায় আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে সমবায় সমিতিকে গণমুখী ও বহুমুখী করার উদ্দেশ্যে সমবায় অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে জাতীয় পলস্নী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতিতে সমবায়ের প্রভাব ও পরিমাণ বিস্তৃত করার লক্ষ্যে সমবায় বান্ধবনীতি আবশ্যক।
আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে সমবায় নিয়ে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ ও সমবায়ভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প নেন। এসব প্রকল্প ও উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬০০ সমবায় সমিতি বিদ্যমান; আর এসব সমবায় সমিতিতে প্রায় ১ কোটিরও বেশি সমবায়ী রয়েছে, যার ১৮ শতাংশ নারী সমবায়ী। এ বিপুলসংখ্যক সমবায়ীকে একই সুতোয় বেঁধে রেখেছে সমবায় দর্শন। আর এ দর্শন আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। সমবায়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের অর্থনীতিকে বিশ্বদরবারে উঁচু স্থানে নেওয়া সম্ভব। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৭টি এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে সমবায় অত্যন্ত কার্যকর উপায়। বর্তমান সরকার যে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, সেখানে সমবায়কে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে তা আরও টেকসই হবে। সরকার বিগত দিনে দারিদ্র্য দূরীকরণে যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা ধরে রাখার জন্য সমবায়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে দেশে কৃষি অর্থনীতির উন্নয়ন টেকসই হবে।
দেশের সমবায়ী কৃষককে কৃষিঋণ প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তৎকালীন সমবায়ী কৃষক এ ঋণ গ্রহণ করে কৃষি ক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করে। বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক দেশের অতি পুরনো ব্যাংক হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে ব্যাংকটিকে তফশিলি ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি; ফলে সমবায় সমিতিগুলো তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমে বড় পরিসরে কোনো ঋণ সুবিধা পাচ্ছে না। সমবায় ব্যাংকটিকে সত্যিকারের সমবায়ীদের ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গতিশীল করতে না পারলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমবায় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অসম্ভব। এছাড়া দেশের সব জেলা-উপজেলায় সরকারি ও মালিকানায় যেসব সম্পদ রয়েছে, তা উদ্ধার করে এখনই সরকারি ও সমবায় মালিকানায় সমবায় হাসপাতাল, সমবায় বিপণিবিতানসহ বিভিন্ন সমবায় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলে আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমবায় দৃশ্যমান হবে। সমবায় সমিতি/সমবায় প্রতিষ্ঠানে সমূহকে আরও উন্নয়নমুখী করতে পারলে দেশ দ্রুত সমৃদ্ধশালী হবে। সমবায়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় দেড় কোটি মানুষ জড়িত। এই দেড় কোটি মানুষের তিন কোটি হাতকে কার্যক্ষম করতে পারলে দেশকে উন্নয়নের উচ্চতায় এগিয়ে নিতে আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। সমবায় একটি শক্তি, সমবায় উন্নয়নের একটি নেটওয়ার্ক। সারা দেশের সমবায়ীদের এই নেটওয়ার্কে সম্পৃক্ত করে ডিজিটাল বাংলাদেশ, জাতির জনকের সোনার বাংলাদেশ গড়তে সমবায় সেক্টরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। সমবায় সমিতি এমন একটি জনকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে থাকে গণতন্ত্র, সম্মিলিত কর্মপ্রচেষ্টা, ব্যাপক উৎপাদন কর্মযজ্ঞ এবং সদস্যদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির প্রয়াস। আধুনিক কৃষির জন্য যে পুঁজি, ঝুঁকি এবং যৌথ উদ্যোগ দরকার তার জন্য প্রয়োজন গণমুখী কৃষিভিত্তিক সমবায় ব্যবস্থা। খাদ্য নিরাপত্তা ও মানুষের দারিদ্র্য দূর করতে হলে কৃষি সমবায়ের কোনো বিকল্প নেই। যথাযথ নীতি এবং সার্বিক সহযোগিতা পেলে কৃষি সমবায় দেশে খাদ্য ঘাটতি দূরীকরণে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, পরিবেশ বিপর্যয় প্রতিরোধ এবং খাদ্য নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টিতে অন্যতম এবং উৎকৃষ্ট পদ্ধতি হলো সমবায়ী উদ্যোগ। এজন্য প্রয়োজন সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের জন্য, নিজের জন্য সমবায় প্রতিষ্ঠা।
দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী একটি পরীক্ষিত স্বীকৃত মাধ্যম হচ্ছে সমবায়। বর্তমানে অর্থনীতির প্রায় সব শাখায় সমবায় তার কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ ও ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে সমবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে আর্থিক ও সেবা খাতে নতুন কার্যক্রম গ্রহণ, বিদ্যমান কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন ও সময়োপযোগীকরণের মাধ্যমে সমবায় অধিদপ্তর বেশ কিছু মৌলিক লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখতে পারে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা আনয়ন, প্রশিক্ষণ ও সেবাপ্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন বিশেষত নারী উন্নয়নে সমবায় নিকট ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
পৃথিবীতে অনেক উন্নত রাষ্ট্রই সমবায়ের কৌশলকে অবলম্বন করে স্বাবলম্বী হয়েছে। বাংলাদেশেও সমবায়ী চেতনায় মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে করে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা উপহার দিয়ে বিশ্ব দরবারে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
 
লেখক : রাজনীতিবিদ, চেয়ারম্যান- ইউসিসিএ লিঃ (কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি) বালাগঞ্জ ও বোয়ালজুর ইউনিয়ন পরিষদ।

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ

Top