Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭, ১৮ জ্বিলক্বদ ১৪৪১

কেমন বাজেট চাই..

-এড. সুয়েব আহমদ

 প্রকাশিত: ১৫, মে - ২০২০ - ০৩:২৫:০৮ PM

 
 
'মঙ্গা' বা 'প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভূমি' বলে খ্যাত বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশের দিকে ধাবিত হচ্ছিল ঠিক তেমনি এক সময়ে কোভিড -১৯ বা করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় বৈশ্বিক অর্থনীতির মত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আজ সংকটের মুখোমুখি। এমনি সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকারের আসন্ন ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষনা অনেকটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে আগামী জুন মাসের ০৯ তারিখ অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করবেন।
করোনা পরিস্থিতির কারণে অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাবনা অনেক; কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যাপ্ত নয়। এ ছাড়াও রয়েছে রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিকসহ নানাবিধ দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান প্রতিকূলতা। বিরাজমান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বিগত দিনে যে বহুমাত্রিক উন্নয়নে সফলতা দেখিয়েছে, তাতে মানুষ আশাবাদী হয়েছে এবং উন্নত জীবনমান ও সমৃদ্ধশালী দেশের স্বপ্নও দেখছে।
যে বাজেট উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে তা প্রণয়নে ও উপস্থাপনায় নতুনত্ব থাকতে হবে।স্বাস্থ্য,শিক্ষা ও কৃষি খাত কে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট হতে হবে বিনিয়োগবান্ধব। বাজেটে প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ কে গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামকে শহরে রূপান্তরের, প্রতি পরিবারের একজনকে চাকরি প্রদানের রূপরেখা, বেকারত্ব নিরসনের, শহর-নির্ভরতা কমানোর, গ্রামে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎসেবা, পাকা রাস্তা, ইন্টারনেট, অনলাইন ব্যাংকিং,শহরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ, উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। দেশি শিল্পকে সুবিধা দিতে হবে। করযোগ্য আয়ের জন্য কর আদায় নিশ্চিত করতে হবে। করের আওতা বাড়াতে হবে। অর্থ পাচার রোধে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। পুঁজি বাজার ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সুস্পষ্ট ঘোষনা থাকতে হবে বাজেটে।
আমাদের বর্তমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বেশিরভাগ শহরকেন্দ্রিক। এবারের বাজেটে গ্রামে শহুরে সুবিধা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে উন্নয়ন সুষম হওয়ার দিকে এগোবে।গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তুলে গ্রামেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে বেশি ফল পাওয়া যাবে। শহর-নির্ভরতা ও শহরে অভিগমন কমবে। এর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
প্রবৃদ্ধি হার ধরে রাখতে এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হলো দক্ষ মানবসম্পদ ও গবেষণা। মানবসম্পদ সৃষ্টি হয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। আমাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত নয়। শিক্ষাও বিশ্বমানের নয়।প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা টিউটর-নির্ভর, যা শিক্ষার্থীর অন্তর্নিহিত মেধা বিকাশের অন্তরায়।শিক্ষায় নিয়ন্ত্রণহীন বাণিজ্যিকীকরণ শিক্ষার মানকে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির বিকল্প নেই। উন্নয়নের স্বার্থেই পরিকল্পিত ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাছাড়া জনশক্তি দক্ষ হলে বৈদেশিক চাহিদা বাড়বে। জনশক্তি রফতানি করে আরও বেশি রেমিট্যান্স পাওয়া যাবে। বেকার সমস্যাও কমে আসবে। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
বিনিয়োগ ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমান বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা লক্ষণীয় এবং এই খাতে ঋণপ্রবাহ প্রবৃদ্ধি হ্রাসমান, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ সন্তোষজনক নয়, বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহও খুব একটা বাড়ছে না। কিন্তু বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতাসহ দূর্নীতি দূর করা প্রয়োজন। বড় অবকাঠামো নির্মাণ, সুষম উন্নয়ন, কর আদায়, এসএমই,মহিলা উদ্যোক্তা খাত কে অগ্রাধিকার দিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো নিশ্চিত না করতে পারলে বিনিয়োগ বাড়বে না। বিনিয়োগ না বাড়লে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতি হারাবে।
আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বলতম হলো ব্যাংক খাত। নিরাপত্তাহীনতা, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এ খাতের বিদ্যমান চরিত্র। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা হলো- উচ্চ খেলাপি ঋণ, নিম্ন মুনাফা, দুর্বল সুশাসন, ক্রমবর্ধমান মূলধন ঘাটতি, পরিচালনার অদক্ষতা।ব্যাংক খাতের এই চরিত্র বদলাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।খেলাপি ঋণ আদায়ে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে সহজে কেউ ঋণখেলাপি হতে উৎসাহিত না হয়, আর্থিক খাত ও দেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে না পড়ে এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
এনবিআর রাজস্ব আদায়ের কাঙিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হয় না।জিডিপি যে হারে বাড়ে সে হারে কর আদায় হয় না। করযোগ্য আয় করে অথচ কর দেয় না অসংখ্য মানুষ। অনেকের টিআইএন নম্বর নেই। যাদের আছে তাদের কেউ কেউ রিটার্ন দেয় না। যাদের বেশি কর দেওয়ার কথা, তারা আয়কর ফাঁকি দেয়।কর রিটার্ন ফরম পূরণ করা কষ্টসাধ্য। নিয়মাবলিও মানুষ জানে না। অনেকে বোঝার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া হয়রানি তো আছেই।
কর প্রশাসনকে উপজেলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার কথা বিবেচনা করা যায়। কর প্রদান সহজতর করা এবং দুর্নীতি রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার করা যেতে পারে। কর আদায়ে অর্থনীতিবিদ স্মিথের চারটি নীতি হলো- করদাতা সামর্থ্য অনুযায়ী কর দেবে। কখন, কিভাবে ও কত কর দেবে, তা করদাতার জানা থাকবে। করদাতা সুবিধাজনক সময়ে কর দেবে এবং কর সংগ্রহের ব্যয় সর্বনিম্ন হবে।
বাজেট বড় হওয়া সমস্যা নয়, যদি এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র সুখকর নয়। বছরের প্রায় নয় মাস ঢিমেতালে চলে। শেষ তিন মাসে তড়িঘড়ি শুরু হয়। ফলে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। বছরের প্রথম থেকে এডিপি বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
লেখক : আইনজীবি, অধ্যাপক ও অ্যাডিশনাল পিপি।

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ

Top