Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, রবিবার, ০৭ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে যোদ্ধারা পালালে কীভাবে চলবে যুদ্ধ?

আ.হ ইমন শাহ্

 প্রকাশিত: ০২, এপ্রিল - ২০২০ - ০৬:২২:৫৮ PM

কোভিড-১৯ নভেল করোনাভাইরাসের ভয়াবহতায় আজ বিপর্যস্থ পুরো পৃথিবী। সবগুলো দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে মরণঘাতী এই ভাইরাস। দেশে দেশে মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে সে এক ভয়ানক আতঙ্ক। এই ভাইরাস মোকাবেলায় এখনো কোনো প্রতিশেধক বা ভ্যাকসিন আবিস্কার করা সম্ভব হয়নি। দিন-রাত পরিশ্রম করেও এখনো কোনা আশার বাণী শোনাতে পারেননি চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। তাই সময়ের সাথে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

এই ভয়াবহ ভাইরাস মোকাবেলায় আমাদের দেশেও প্রায় তিন মাস আগে থেকে সবধরণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবুও কোনো এক অজানা কারণে ভেঙে পড়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থা। সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ আর দূরদর্শীতায় করোনার চিকিৎসা স্বাভাবিকভাবে চললেও অন্যান্য চিকিৎসা সেবায় দেখা দিয়েছে মারাত্মক অব্যবস্থাপনা।

করোনার কারণে অন্য রোগীদের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ঠাণ্ডা-সর্দি, জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্টের অনেক রোগীকে চিকিৎসকরা সেবা দিচ্ছেন না। ডাক্তাররা নির্দয় আচরণ করছেন রোগীদের সঙ্গে। অনেক রোগী এক সপ্তাহ ধরে সেবা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছেন না ডাক্তাররা। জ্বর থাকলেই ফিরিয়ে দিচ্ছে প্রাইভেট হাসপাতালগুলো। বেশির ভাগ ডাক্তার সর্দি-কাশি-জ্বর ও গলা ব্যথা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেবেন না বলেও লিখে রেখেছেন। বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশনের কারণে জ্বর বা শ্বাসকষ্ট অনুভব হওয়া রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসকরা ঠাণ্ডা-সর্দি-জ্বর-কাশি ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের স্পর্শ পর্যন্ত করছেন না। কাউকে কাউকে আইইডিসিআরের হটলাইন নম্বর দেখিয়ে বিদায় করা হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের পাদুর্ভাবে দেশের প্রতিটি এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থার এমনই হাল।

এমন বিপর্যয় মুহূর্তে সাধারণ রোগ-বালাই নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের মানুষ। স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিভিন্ন সাধারণ রোগে আক্রান্ত রোগীরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বর-সর্দি ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা নিয়ে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে প্রতিদিনই। কোথাও কোথাও এসব মৃত্যুর খবরে এলাকায় করোনার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, কোথাও আবার বাড়ি বা লকডাউন লকডাউন করা হচ্ছে পুরো গ্রাম। আর নিউমোনিয়া জাতীয় কোনো অসুখের খবর শুনলেই রোগীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। যশোরে জ্বরে আক্রান্ত এক নারী হাসপাতালে যেতে চাইলে কোনো যানবাহনই তাকে নিতে চায়নি। এমনকি একটি অ্যাম্বুলেন্স এলেও রোগের লক্ষণ শুনে পালিয়ে যান চালক। প্রতিনিয়ত চারিদিক থেকে এরকম খবরের পাশাপাশি আসছে মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরও।

চিকিৎসকরা বলছেন করোনা ভাইরাস সন্দেহভাজন রোগীদের সেবাদানে হাসপাতালে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয়সংখ্যক নিরাপত্তা সরঞ্জাম যেমন—পিপিই, হ্যান্ড গ্লাভস, অ্যাপ্রোন, বিশেষ গাউন, সার্জিক্যাল মাস্ক, চশমা ও জীবাণুমুক্তকরণ রাসায়নিক উপাদানের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে, রোগীদের জন্য মানসম্মত কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন অবকাঠামো না থাকায় সংক্রমণ ঝুঁকি রয়েছে। ঠান্ডা-কাশি ও শ্বাসকষ্ট করোনার উপসর্গও হতে পারে। তাই তারা রোগী সেবা দিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন বলে যুক্তি তুলে ধরছেন তারা।

বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিকরা বলছেন- ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা কেন ঝুঁকি নেবে? সবার আগে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে ২ লাখ পিপিই বেসরকারি হাসপাতালে দেওয়া হলে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া ডাক্তার-নার্সসহ সেবাকর্মীদের ইন্সুরেন্সের ব্যবস্থা করা উচিত। এসব নানা কারণে অনেকে ডিউটি করতে চান না। আগে ব্যবস্থাপনা জরুরি।

এদিকে ৩১ মার্চ মঙ্গলবার সারাদেশে বিভিন্ন জেলায় ভিডিও কনফারেন্সের একপর্যায়ে বরগুনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে কথা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন পিপিই তো পড়বে শুধু তারা যারা কী না করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করবে। বাকীরা সাধারণ চিকিৎসা প্রদানকালে সার্জিক্যাল মাস্ক ও তাদের সাধারণ গাউন পরবে।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় সকল প্রাইভেট সেক্টরের ডাক্তারগণ, বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক/হাসপাতাল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা তথা পিপিই না থাকার কারণে রোগী দেখছেন না।এমন কী সরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে বেশিরভাগ ডাক্তাররা অনুপস্থিত। ডাক্তাররা নিজেদের নিরাপত্তা সংকটের কারণে, পিপিই না থাকার কারণে এই ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণে হয়তো বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু শুধু পিপিই এর জন্য করোনা সংক্রমণের ভয়ে যদি ডাক্তারগণ রোগী না দেখেন, রোগীকে সুস্থ না করেন তবে দেশ বিশাল এক মহামারীর সম্মুখীন হবে ।

ডাক্তারদের এটা ভেবে দেখা উচিত যে একজন ডাক্তারের নিকট বা প্রাইভেট হাসপাতাল/ ক্লিনিকগুলোতে শুধু করোনা রোগীই চিকিৎসা সেবা নিতে যায় না। আর এমন নয় যে করোনা ভাইরাসের কারণে মানুষের অন্য রোগবালাই উধাও হয়ে গেছে । করোনা ছাড়া বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষগুলো কোথায় যাবে? তারাও কি এই পিপিই এর কারণে তাদের চিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? মানুষের চিকিৎসা সেবা পাওয়ার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করণে প্রয়োজনে নিউমোনিয়া, সর্দি, কাশির তথা সাসপেক্টটেড করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট আলাদা ইউনিট করে অন্যান্য জটিল রোগীদের নির্বিঘ্নে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারেন। তবে এজন্য দরকার প্রাইভেট হাসপাতাল/ক্লিনিক ও প্রাইভেট ডাক্তারগণের সদিচ্ছা।

জন্ম মৃত্যুর মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। মহান আল্লাহর উছিলায় এই পৃথিবীতে মানুষ জন্ম মৃত্যু ও সুস্থতার জন্য যাদের কাছে যান বা যাদের দ্বারা মানুষের রোগমুক্তি ঘটে তারা হলেন আমাদের ডাক্তারগণ। ডাক্তার সুস্থ্য থাকলেই রোগী সুস্থ থাকবে। তারাই যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে রোগীদের কে সুস্থ করে তুলবে? রোগীর সুস্থতার জন্য, সঠিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করণের জন্য ডাক্তার, সহকারী ও নার্সদের গ্রেড অনুসারে পিপিই খুবই প্রয়োজন ।

তাছাড়া এই সংকট থেকে উত্তোরণের পথ তো আমাদেরই বের করতে হবে। পিপিই নাই বলে তো আর বসে থাকা যাবে না । এই সাময়িক দুঃসময় থেকে উত্তোরণের জন্য অবশ্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে ইতোমধ্যে বেশিরভাগ ডাক্তারদেরকে  সরকার বিভিন্নভাবে পিপিই প্রদান করেছে। আর প্রাইভেট হাসপাতাল ও ব্যক্তিগত চেম্বারে যারা রোগী দেখেন আপনারা নিজেরাই কেনো নিজেদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা পিপিই’র ব্যবস্থা করছেন না? এগুলোর দাম তো আর লাখ কিংবা কোটি টাকা নয়। হাজার দুই সে যাই হোক এটা তো আপনাদের সামর্থের বাহিরে নয়। আপনারা তো মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে থাকেন। তাও যদি না পারেন বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর কাছেও তো চেয়ে নিতে পারেন। এমনিতেই তো প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন কোম্পানীর কাছ থেকে হাজারো উপহার গ্রহণ করে থাকেন।

যাই হোক যেসব ডাক্তাররা পিপিই’র অজুহাত আর ভাইরাস আক্রমণের ভয়ে মানুষকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করছেন। আপনাদের মনে রাখা উচিত সব মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। যখন, যেখানে যার মৃত্যু হবার কথা সেখানেই হবে। মৃত্যু আসলে কোনো ধরণের কোনো সুরক্ষা সামগ্রীই আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না। আর মৃত্যুর পর টাকা পয়সা নিয়েও কবরে যেতে পারবেন না। 

ডাক্তাররা সাহসী হন। সাধারণ মানুষের চেয়ে ডাক্তারদের সাহস বেশিই হয়ে থাকে। যাদের সাহস কম তারা ডাক্তার হতে পারেন না। আমরা জানি সাহসের সাথে সেবার মানসিকতা নিয়েই তারা এই পেশায় এসেছেন। সাধারণ মানুষের চেয়ে ডাক্তাররা কয়েক গুণ বেশি সচেতনও হয়ে থাকেন। তাদের সচেতনতার জন্য করোনা ভাইরাস সংক্রমণের শঙ্কাও কম হওয়ার কথা৷

২৫ মার্চ বুধবার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আতঙ্কিত না হয়ে দেশবাসীকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ ৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলে যুদ্ধ করেছে। করোনা ভাইরাস মোকাবেলাও একটি যুদ্ধ। তাই এই যুদ্ধে ঘরে থাকাই জনগণের দায়িত্ব।

প্রধানমন্ত্রীর সুরে সুর মিলিয়ে আমিও বলতে চাই এই যুদ্ধে আপনারা ডাক্তাররাই হলেন মূল যোদ্ধা। এই যুদ্ধের ময়দানে আপনারাই হলেন বীর সৈনিক। এই যুদ্ধে আপনারাই পারেন দেশ, জাতি আর দেশের মানুষকে বাঁচাতে। কিন্তু ভয় পেয়ে আপনারা যোদ্ধারাই যদি যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়েন যান, তাহলে কীভাবে চলবে এই যুদ্ধ? কীভাবে আসবে বিজয়?

যাই হোক; আমাদের বিশ্বাস দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে আপনারা ভয় পেয়ে ময়দান ছেড়ে পালাবেন না। আপনাদের তো সাহসের কমতি নেই। আপনারা নিজেদের সুরক্ষিত রেখে সাহসের যুদ্ধ করবেন। করোনা রোগীদের পাশাপাশি এই সময়ে অন্যান্য রোগীদের সঠিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করবেন। মানুষের পাশে থেকে একদিন বিজয় ছিনিয়ে আনবেন এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: কবি ও গণমাধ্যম কর্মী

এ বিভাগের​ আরও খবর


সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ

Top