Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭, ৯ জ্বিলক্বদ ১৪৪১

তোফায়েল আহমেদ’র ‘আমার মা’

 প্রকাশিত: ২৮, জানুয়ারি - ২০২০ - ০৫:১৯:৩৯ PM

ভাইরাল তোফায়েল আহমেদের লেখা `আমার মা’
আজ মায়ের ত্রয়োদশ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৬-এর ২৫ ডিসেম্বর সবার মায়া ত্যাগ করে তিনি এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। পৃথিবীতে প্রতিটি সন্তানের কাছে মা পরমারাধ্য। আমার জীবনেও মা প্রিয় মানুষ, শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মায়ের স্নেহ-আদর আর মমতায় বড় হয়েছি।

মায়ের স্নেহরাজি আজও অন্তরে প্রবহমান। মায়ের স্নেহভরা পবিত্র মুখখানি যখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে, মনে হয় এখনই মায়ের কাছে ছুটে যাই। জন্মলগ্ন থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মা যত্ন করে আমায় গড়ে তুলেছেন। মা ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারতাম না। শৈশব আর কৈশোরের সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়।

প্রতিবার নির্বাচনী জনসংযোগে যাওয়ার প্রাক্কালে কাছে টেনে পরমাদরে কপালে চুমু খেয়ে আমার সার্বিক সাফল্য কামনায় প্রাণভরে দোয়া করতেন মা। আজ নির্বাচনের সময় মায়ের অভাব হৃদয় দিয়ে অনুভব করি, মনে করি, মাতৃত্বভরা মমতাময়ী মায়ের সেসব কোমল স্মৃতি।

আমার বাবার নাম আজহার আলী, মা ফাতেমা খানম। আমি দাদা-দাদি, নানা-নানিকে দেখিনি। মা ১৯১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সেই ছোট্টকালেই যখন আমার বয়স মাত্র ১৩, তখন আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীর বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করতে হয়েছে। কষ্ট হলেও মা আমাকে আদর করে লেখাপড়ায় নিয়মিত উৎসাহ জোগাতেন।

সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারের পর যখন অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছি সে সময় সংবাদ পাই, ভোলা সরকারি হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে চারটি আসন খালি আছে। সর্বমোট শ’খানেক ছাত্র ভর্তি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হই। মাত্র চারটি শূন্য আসনের বিপরীতে শতজন। ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখি তীব্র সে ভর্তি প্রতিযোগিতায় আমার স্থান প্রথম।

এভাবেই ১৯৫৭-র জানুয়ারি মাসে ভোলা সরকারি স্কুলে ভর্তি হই এবং স্কুল হোস্টেলে থাকতে শুরু করি। শুরু হয় হোস্টেলে থেকে লেখাপড়ার পালা। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৪টি বছর আমি হোস্টেলে ছিলাম। মা আমাকে আদর করে ‘মনু’ বলে ডাকতেন। সব সময় বলতেন, ‘মনু, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করো।’

মায়ের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম। তার ফল পেয়েছি পরীক্ষায় ভালো করে। বার্ষিক পরীক্ষায় হয় প্রথম, নয় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। মা’কে ছেড়ে জীবনের প্রথম হোস্টেল জীবন। মন পড়ে থাকত মায়ের কাছে। অপেক্ষায় থাকতাম কখন মায়ের কাছে যাব। প্রতি সপ্তাহে ছুটির আগের দিন মায়ের কাছে চলে যেতাম।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় চার নেতাসহ আমরা ছিলাম গৃহবন্দি। ১৫ আগস্টের দু’দিন পর ১৮ আগস্ট আমার বাসভবনে এসে খুনিদের অন্যতম মেজর শাহরিয়ার (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে) এবং ক্যাপ্টেন মাজেদ (পলাতক) বলপ্রয়োগে আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন করা হয়।

পরবর্তী সময়ে জেনারেল শফিউল্লাহ এবং প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার শাফায়াত জামিল- তিনি তখন ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার, তাদের প্রচেষ্টায় রেডিও স্টেশন থেকে আমাকে বাড়িতে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। মায়ের শরীরের ওপর দিয়েই আমায় টেনে নিয়েছিল ঘাতকের দল। ’৭৫-এর পর চরম দুঃসময়। আমি তখন কারাগারে।

দেশজুড়ে কারফিউ, হত্যা, গুম, গ্রেফতার আর ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা। অবর্ণনীয় করুণ অবস্থায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আমাদের কেটেছে। আমার স্ত্রীকে কেউ বাড়ি ভাড়া দেয়নি।

তোফায়েল আহমেদের স্ত্রীকে বাড়ি ভাড়া দিলে আর্মি ধরে নিয়ে যাবে। আমার ভাগনিজামাই নজরুলের নামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে পরিচয় গোপন করে মাসিক দেড় হাজার টাকা ভাড়ায় সেই বাড়িতে আমার স্ত্রী থেকেছেন। তিনি এক বছর ছিলেন কলাবাগানে। সেই বাসায় কোনো ফ্যান ছিল না। পরে বরিশালের সাবেক এডিসি এমএ রবের কল্যাণে তার আজিমপুরের বাসার দোতলায় আমার পরিবারের ঠাঁই হয়।

কারামুক্ত হয়ে ফিরে সেই বাসায় থেকেছি। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। সেই সময় করুণ অবস্থা গেছে আমার পরিবারের। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাত্র ২২,০০০ টাকা, স্ত্রীর নামে ৮,০০০ আর মেয়ের নামে ৪,০০০ টাকা। জিয়াউর রহমান এগুলো ফ্রিজ করেছেন। আমরা ওই টাকা তুলতে পারলাম না।

আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেয়ার বহু রকম চেষ্টা করেছেন। কোনো দুর্নীতি আবিষ্কার করতে পারেননি। কোনো মামলা দিতে পারেননি। আমার বনানীর বাড়ির জমি বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন। ’৭৫-এর ৩০ জুলাই বরাদ্দ করেন আমার স্ত্রীর নামে। আমার বড় ভাই ’৭৫-এর ১১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। বড় ভাই যখন হলিফ্যামিলি হাসপাতালে, মা তখন অসুস্থ।

আমাকে বলেছিলেন, মাকে দেখতে চাইলে তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি গিয়েছিলাম। মা বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু বড় ভাই মায়ের আগেই মৃত্যুবরণ করেন। সংবাদ পেয়ে বঙ্গবন্ধু আমার তৎকালীন সরকারি বাসভবনে এসে আমাকে আদর করে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন।

আমার ভাইয়ের জানাজায় অংশগ্রহণ করে ভাইয়ের মৃতদেহ তিনি হেলিপ্যাডে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে ভোলায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সে সময় যতদিন ভোলায় ছিলাম, ১২ থেকে ৩০ জুলাই প্রতিদিন বঙ্গবন্ধু আমার খবর নিতেন।

তখন টেলিফোন সহজলভ্য ছিল না। থানার টেলিফোনে, নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ বেলা ১১টায় আমাকে থাকতে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন ফোন করে আমার খোঁজ নিতেন। সেই স্মৃতি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে।

আমার এপিএস ছিল শফিকুল ইসলাম মিন্টু। ১৫ আগস্টের পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য খুনিচক্রের অন্যতম ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বে কিছু সেনাসদস্য তাকে ধরে নিয়ে যায়।

কিন্তু মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় মিন্টুকে হত্যা করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়। তার মৃতদেহটি পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমার মেজো ভাইকে গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ’৭৫-এর ৫ অক্টোবর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি তখন ময়মনসিংহ কারাগারে। তিন ছেলের দু’জন মৃত, একজন কারাগারে। তখন মায়ের করুণ অবস্থা।

এ অসহায় অবস্থায় মা জীবন কাটিয়েছেন। আমার ঢাকার বাসায় বড় ভাইয়ের ছেলে এবং মেয়ে, মেজো ভাইয়ের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে থাকে। তারা কেউ পড়ে স্কুলে, কেউ বা কলেজে। আমার বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর একটি ছেলের জন্ম হয়। তার নাম ‘মইনুল হোসেন বিপ্লব’। শৈশব থেকে আমি তাকে পিতৃস্নেহে বড় করেছি। সে এখন আমারই ছেলে। আমাকে ‘আব্বু’ বলে সম্বোধন করে।

আপন ছেলের থেকেও তাকে বেশি আদর করি। সত্যিকারই সে আদর পাওয়ার যোগ্য। আমার স্ত্রী তাকে বরিশাল ক্যাডেট কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করেছিল। সেখান থেকে সে মেধার ভিত্তিতে ম্যাট্রিকে ৫ম এবং ইন্টারমিডিয়েটে ৯ম স্থান অধিকার করে। তারপর অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছে। বিপ্লবের দুই মেয়ে।

আমার পরমাদরের ‘প্রিয়ন্তী’ ও ‘শ্রাবন্তী’। আমি ওদের ‘জান’ বলে সম্বোধন করি। ওরাও আমাকে ‘জান’ বলে সম্বোধন করে। ওরা সকাল ৮টায় স্কুলে যাওয়ার আগে আমাকে চুমু দিয়ে স্কুলে যায়। আমার মেয়ের ঘরের একমাত্র নাতি সবার আদরের নাম তার ‘প্রিয়’; সে এখন নিউইয়র্কে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমার মেয়েও তার সঙ্গে আছে। প্রতিদিন আমি তার কথা মনে করি। মা প্রিয়কে ভীষণ আদর করতেন।

আমার জামাতা ‘ডা. তৌহিদুজ্জামান’, যাকে আমরা আদর করে ‘তুহিন’ বলে ডাকি- স্কয়ার হসপিটালের নামকরা ডাক্তার, কার্ডিওলজিস্ট। ’৯৫ সালে ওদের বিয়ে হয়। আমার মেয়ে ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী যখন ছোট, তখন আমার মায়ের সঙ্গে ঘুমাত এবং মা ওকে ভীষণ আদর করত।

এখনও মায়ের স্মৃতি আমার মেয়েটি ধরে রেখেছে। মা যখন চিকিৎসাধীন, আমার মেয়ে ও জামাতা উভয়েই আমার মায়ের যে সেবা-যত্ন করেছে তা অকল্পনীয়। আমার বড় ভাইয়ের বড় ছেলে টুটুল। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড়। ওয়ারীর ক্যাপ্টেন ছিল। আবাহনীতেও খেলেছে। ২০০৪-এ আকস্মিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে।

মায়ের সঙ্গে দেখা করে মোটরবাইকে চেপে যখন ফিরছিল, তখন একটি বেপরোয়া গাড়ি তার মোটরবাইককে চাপা দেয়। টুটুলকে তিনি এত ভালোবাসতেন যে মৃত্যু সংবাদটি শুনলে সহ্য করতে পারবেন না, এ জন্য মৃত্যুসংবাদটি মাকে কখনোই জানানো হয়নি।

’৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আমি ৩৩ মাস কারাগারে বন্দি ছিলাম। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বমোট সাতবার আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং প্রতিটি জায়গায় আমার বৃদ্ধা মা ছেলেকে দেখার জন্য ছুটে গিয়েছেন। সে কী কষ্ট! জেলগেটে যখন মা আমার সঙ্গে দেখা করতেন, সর্বক্ষণ আমার মাথাটা তার বুকে থাকত। তারপর যখন তিনি আমাকে রেখে বিদায় নিতেন, তখন তার দুই চোখে অশ্রুর নদী। দুই ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে, এক ছেলে কারান্তরালে। কী নিঃস্ব রিক্ত আমার মা!

সেই কঠিন দিনগুলোর কথা মনের পাতায় ভেসে ওঠে। মায়ের স্মৃতিকে আমি ধরে রাখতে চাই। বাবা-মায়ের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মায়ের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। জীবনে স্বপ্ন ছিল বৃদ্ধাশ্রম করার। যেখানে আমার মায়ের মতো মায়েদের সেবা-শুশ্রূষা করতে পারব। ২০০২-এ মায়ের বয়স তখন ৮৮ বছর।

অসুস্থ শরীরেও তিনি আমাকে দেখতে কুষ্টিয়া কারাগারে ছুটে গিয়েছেন। একনজর মায়ের মুখখানি দেখে মনে অনাবিল শান্তি অনুভব করেছি। মা ছিলেন ধর্মপরায়ণ এমন একজন মানুষ, যিনি সব সময়ই অপরের কল্যাণের কথা ভাবতেন। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন প্রতিবেশী যে কারও দুঃখে তিনি ছুটে যেতেন। সাধ্যমতো সাহায্য করতেন।

আমাকে সব সময় বলতেন, ‘তুমি একা বড় হতে পার না। সবাইকে সঙ্গে করেই তোমাকে এগিয়ে যেতে হবে।’ মা সুখে-দুঃখে আমায় ছায়া দিতেন বটবৃক্ষের মতো। ’৯৬-তে সরকার গঠনের পর আমি তখন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। বেইলি রোডের বাসভবন ‘তন্ময়’-এ থাকি। মা আমার সঙ্গেই থাকতেন। প্রতিদিন মায়ের আদর নিয়ে তবেই দিনের কাজ শুরু করতাম। বনানীর যে বাসায় এখন থাকি, এই বাসায় আমার শয়নকক্ষের পাশেই মায়ের ঘর।

সকালে ঘুম ভাঙার পর মায়ের স্নেহের আলিঙ্গন, আদর ছিল নিত্যদিনের পাথেয়। মাকে চুমু দিয়ে সকালে বের হতাম। আমি না ফেরা পর্যন্ত মা জানালার কাছে হাতে তসবিহ নিয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন কখন ফিরি। ঘরে প্রবেশ করেই মাকে চুমু দিয়ে রুমে যেতাম। সেই দিনগুলোর কথা আজও মনে পড়ে। আমার বন্ধুবান্ধব-স্বজন প্রত্যেককেই মা অন্তর থেকে ভালোবাসতেন, আদর করতেন। মা আমার জীবনে অনুপ্রেরণার নিরন্তর উৎস হয়ে সদা বিরাজমান।

মা যখন অসুস্থ তখন প্রত্যেকেই তার সেবা-শুশ্রূষা করেছেন। পরম শ্রদ্ধাভাজন জনাব জয়নাল আবেদীন শিকদার, যাকে আমি চাচা বলে সম্বোধন করি, তিনিও আমাকে পুত্রবৎ স্নেহ করেন। তারই গুলশানের শিকদার হাসপাতালে মায়ের শেষজীবনের চিকিৎসাদি চলে। প্রায় দু’বছর তিনি বাসা এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

মৃত্যুর দু’দিন আগে আমি যখন নিজ হাতে মাকে খাওয়াচ্ছিলাম তখন তিনি ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় মা আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি কী আমাকে মরতে দেবে না?’ আমি উত্তরে বলেছিলাম, মা আপনি যদি মৃত্যুবরণ করেন তখন আমাকে দোয়া করবে কে? মা আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে আমি আল্লাহর কাছে রেখে গেলাম। আল্লাহই তোমাকে হেফাজত করবে।’ এটাই ছিল মায়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা। মায়ের মৃত্যুদিনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বনানীর বাড়িতে এসে মাকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর চেতনায় গড়ে উঠেছে আমার রাজনৈতিক জীবন। আর মায়ের মানবিক গুণাবলির প্রভাবে বিকশিত হয়েছে ব্যক্তি জীবন। ’৭৩-এ ভোলার বাংলা বাজারে মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেছি একটি গার্লস হাইস্কুল। যার নাম ‘ফাতেমা খানম গার্লস হাইস্কুল’। আজ সেখানে ৬০ বিঘা জমির ওপর মায়ের নামে ‘ফাতেমা খানম ডিগ্রি কলেজ’, ‘ফাতেমা খানম হাসপাতাল’, ‘ফাতেমা খানম এতিমখানা’, ‘ফাতেমা খানম জামে মসজিদ’, ‘ফাতেমা খানম বৃদ্ধাশ্রম’সহ বিশাল এক কমপ্লেক্স।

এ কমপ্লেক্সেই গরিব-দুঃখী মানুষের চিকিৎসাসেবায় পিতা-মাতার নামে ‘আজহার আলী-ফাতেমা খানম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। মায়ের নামে স্থাপিত হতে যাচ্ছে ‘ফাতেমা খানম মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র’।

ভোলায় গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে আমার পরম শ্রদ্ধেয় মা-বাবা যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত, সেখানে কবর ফলকে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি উৎকীর্ণ আছে এভাবে-


‘মা, বাবা চলে গেছেন অনেক আগে

চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তোমারই পাশে

তুমিও চলে গেলে আমাদের

সকলকে কাঁদিয়ে,

তবুও তোমরা আছো সর্বক্ষণ

আমাদের হৃদয় জুড়ে।

মা, প্রতি মুহূর্ত তোমাদের অভাব

অনুভব করি।’

তোমার মনু (তোফায়েল)

তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ।

এমপি তোফায়েল আহমেদের এই লেখাটি সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে।

Top