Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬, ১৫ রবি-উল-আউয়াল ১৪৪১

উচ্চ রক্তচাপ: কখন এবং কতদিন ওষুধ খাবেন?

 প্রকাশিত: ০৬, নভেম্বর - ২০১৯ - ০৬:২২:৩২ PM - Revised Edition: 30th April 2019

উচ্চ রক্তচাপ: কখন এবং কতদিন ওষুধ খাবেন?
 

*কখন উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলবেন

*দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপের অসুবিধা

*কখন এবং কতদিন ওষুধ খাবেন?


উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন অত্যন্ত পরিচিত একটি রোগ। পূর্ণবয়স্ক মানুষের শতকরা পঁচিশ থেকে ত্রিশভাগ মানুষ এই রোগ দিয়ে আক্রান্ত। সমস্যা হল অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীরা কোন লক্ষণ বোধ করেন না। অর্থাৎ কোন উপসর্গ বা শারীরিক অসুবিধা বোধ করেন না। সুতরাং জটিলতা না হলে তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না এবং চিকিৎসাও নেন না। কিন্তু জটিলতা যখন দেখা দেয় ততদিনে রোগটি অনেকদূর গড়িয়ে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর গুরুতর ক্ষতিসাধন করে ফেলে।

উচ্চ রক্তচাপ কখন বলব?

অনেকে মনে করেন অতিরিক্ত টেনশন থেকে হাইপারটেনশন সৃষ্টি হয়। উচ্চ রক্তচাপের সাথে টেনশনের একটি দূরবর্তী সম্পর্ক থাকলেও তা সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। প্রথমত আসি হাই প্রেসার আমরা কখন বলব? আমরা যদি ব্যায়াম করি, সিঁড়ি ভেঙ্গে চার পাঁচতলায় উঠি বা কোন কারণে রেগে যাই, উত্তেজিত হই তাহলে আমাদের প্রেসার সাময়িক হলেও বেড়ে যেতে পারে। নিরিবিলি পাঁচ দশ মিনিট বিশ্রাম নিলে প্রেসার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।এটা কি তবে হাইপারটেনশন ? না। হাইপারটেনশন হল দিনের বেশিরভাগ সময় ধরে প্রেসার উপরে উঠে বসে থাকা( persistent elevation of blood pressure)।

এজন্য আমরা যেটা করি কিছুদিনের ব্যবধানে অন্তত দু’ তিনটে মাপ নেই। তাতে যদি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রেসার বাড়তি পাই অর্থাৎ ১৪০/৯০ বা তার বেশি পাই তাহলে বলব যে, তার উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হয়েছে। তবে আবার বলি হাইপারটেনশন রোগ বলার আগে ভালভাবে নিশ্চিত হতে হবে। সঠিক পরিবেশ ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিয়ে চাপ পরিমাপ করতে হবে।

যদি উপরের প্রেসার (systolic) ১৩০ এর উপরে কিন্তু ১৪০ এর নীচে এবং নীচের প্রেসার (diastolic) ৮০ থেকে ৯০ এর মধ্যে থাকে তাহলে তাকে ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করতে হবে । কেননা এদের প্রেসার যেকোন সময় হাইপারটেনশন এর সীমায় প্রবেশ করতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপের অসুবিধা কি?

হার্টে সমস্যা হলে রোগী সহজেই বুঝতে পারেন, কেননা রোগী বুকে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া শ্বাসকষ্ট এসব লক্ষণের মুখোমুখি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের প্রায় নব্বই শতাংশ রোগীর কোন উপসর্গ বা লক্ষণ থাকে না। সাধারণত কোনো রুটিন চেক আপ করতে গিয়ে এটি ধরা পড়ে। মাত্র দশ শতাংশ রোগীর মাথা ব্যথা, মাথা ঘুরানো, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট হওয়া ইত্যাদি উপসর্গের কথা বলে থাকেন। অর্থাৎ বিপুল অধিকাংশের কোন উপসর্গ না থাকায় তারা চিকিৎসা গ্রহণে অনিহা প্রকাশ করেন। তাছাড়া চিকিৎসা ব্যয়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে রোগের কোন লক্ষণই নেই তার জন্য জীবনভর চিকিৎসা চালিয়ে যাবার যুক্তি তারা খুঁজে পান না।

এটি একটি সমস্যা। চিকিৎসকদের ধৈর্য্য নিয়ে রোগীদের বুঝাতে হবে যে, প্রেসার নিয়ন্ত্রণ না করলে শরীরের ভাইটাল অঙ্গসমূহ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। হার্ট উচ্চ রক্তচাপের বিপরীতে পাম্প করতে থাকলে তার দেয়ালগুলো অস্বাভাবিকরকম মোটা হয়ে যাবে। তার নিজস্ব রক্ত সরবরাহ বাঁধাগ্রস্ত হবে। করোনারী রক্তনালীতে ব্লক দেখা দিবে, হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকিতে পড়বে, হার্টের পাম্পিং ক্ষমতা কমে গিয়ে ফুসফুসে পানি আসবে, শুতে ঘুমোতে চলতে ফিরতে রোগীর কষ্ট হবে। অর্থাৎ হার্ট ফেইল্যুর দেখা দিবে।

তেমনিভাবে কিডনী ধীরে ধীরে অকেজো হবে, ডায়ালাইসিস লাগবে, কিডনী বদল করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব করে তুলবে।

অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপে ব্রেণ স্ট্রোক হবার ঝুঁকি বাড়বে, প্যারালাইসিস হয়ে জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলবে।

এছাড়া রেটিনা ধ্বংস করে দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিতে পারে।

পায়ের বড় বড় ধমনীতে ব্লক সৃষ্টি করে গ্যাংরিন তৈরী করতে পারে।

বুকের এবং পেটের মহাধমনীর ক্ষতিসাধন করে aneurysm সৃষ্টি করে এবং সেটি ফেটে গিয়ে মুহূর্তে জীবনাবসান হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ কখন এবং কতদিন ওষুধ খাবেন?

অনেকেই প্রেসারের ওষুধ শুরু করতে দ্বিধা করেন এই ভেবে যে, ওষুধ শুরু করলে তো বন্ধ করা যাবে না। তাই যত দেরিতে শুরু করা যায় তত ভাল। এটি একটি বদ্ধমূল ভুল ধারণা। মূল কথা হল প্রেসার সীমার মধ্যে রাখতে হবে, নইলে ভাইটাল অরগ্যানগুলো নষ্ট হবে। তাই জীবনাচরণ পরিবর্তন (lifestyle modification ) করার পরেও যদি প্রেসার সীমার মধ্যে না আসে তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওষুধ শুরু করতে হবে। এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য তা চালিয়ে যেতে হবে।

গর্ভাবস্থায় বিশেষ সতর্কতা

প্রজননক্ষম মহিলাদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যাঁদের গর্ভধারণের আগেই হাই প্রেসার ধরা পড়ে তাদেরকে বিশেষ সতর্কতার সাথে প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সবধরণের ওষুধ গর্ভধারণে ইচ্ছুক মহিলাদের দেয়া যাবে না। কারণ কিছু কিছু ওষুধ গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি করতে পারে। তাই আগে থেকেই পরিকল্পনা করে সন্তানধারণ করতে হবে। গর্ভে সন্তান এলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে চেক আপ করিয়ে সঠিক ওষুধ গ্রহন করতে হবে। তবে প্রেসার সব সময় ১৩০/৮০ এর নীচে রাখতে হবে। একবার ওষুধ শুরু করলে মাসে মাসে চেক আপ করিয়ে ডোজ সমন্বয় করতে হবে।

মনে রাখা দরকার যে, উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে একলামসিয়া, প্রি-একলাসিয়ার ঘনিস্ট সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দেশে উচ্চ মাতৃমৃত্যু এবং নবজাতক মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হল একলামসিয়া/প্রিএকলামসিয়া।

ওষুধ বন্ধ করবেন কখন?

সাধারণভাবে প্রেসারের ওষুধ অনির্দিষ্টকালের জন্য খেয়ে যেতে হবে। তবে কোন কোন সময় সাময়িকভাবে ওষুধ বন্ধ রাখতে হতে পারে। যেমন হঠাৎ বমি পাতলা পায়খানা শুরু হলে এমনিতেই প্রেসার কমে যায়। জ্বর হলেও প্রেসার কমে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রেসার পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করতে হবে। চিকিৎসক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ওষুধ সাময়িক বন্ধ রেখে বা মাত্রা কমিয়ে দিতে পারেন এবং যত দ্রুত সম্ভব সেটি আবার শুরু করার নির্দেশ দিবেন ।

ফলো আপ কখন করবেন?

ওষুধ শুরু করার প্রথম দিকে একটু ঘনঘন ফলো আপ দরকার হবে। ওষুধ কার্যকর হচ্ছে কিনা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা এগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একবার সবকিছু ঠিকঠাক মত চললে তিন মাস ছয় মাস পরপর ফলো আপ করতে হবে। ফলো আপের সময় রক্তের creatinine, electrolytes, sugar, cholesterols ইত্যাদি পরীক্ষা করে নিলে ভাল। বছরে একবার ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম করে নিতে হবে। এসব পরীক্ষায় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে চিকিৎসক তা ঠিকঠাক করে দিবেন।

লেখক: সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল

আরও পড়ুন : কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ: কী করবেন?

Top