Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৬ মাঘ ১৪২৬, ১ জুমাদিউস-সানি ১৪৪১

অক্টোবরে আ’লীগের জাতীয় সম্মেলন হবে কি?

 প্রকাশিত: ৩১, জুলাই - ২০১৯ - ০৭:০৯:৫৯ PM

 

গত এক দশক ধরে নির্ধারিত সময়েই সম্মেলন করে আসছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। দলটির সর্বশেষ কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর। সে হিসাবে আগামী অক্টোবরের ২৩ তারিখে শেষ হচ্ছে তিন বছরের জন্য গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংগঠনকে যুগোপযোগী ও গতিশীল রাখতে নির্ধারিত সময়েই সম্মেলন সম্পন্ন করতে আগ্রহী আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা। অক্টোবরকে সামনে রেখে সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হলেও ওই মাসে তা আয়োজন করা সম্ভব হবে কি? নাও হতে পারে বলে জানিয়েছেন দলের একাধিক নীতিনির্ধারক।

দলীয় সূত্র জানায়, শোকের মাস আগস্ট শুরু হচ্ছে। আগস্টে শোকের কর্মসূচি ছাড়া সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড খুব কমই হয়। এরপর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে যাবেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফিরবেন সেপ্টেম্বরের শেষে বা অক্টোবরের প্রথমে। যে কারণে অতি অল্প সময়ে সম্মেলন আয়োজন সম্ভব নাও হতে পারে।

আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের বিষয়ে জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সম্মেলনের জন্য কিছু প্রস্তুতি শুরু হয়েছে অনেক আগেই। তবে চলতি মাসে অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সম্মেলন নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। সম্মেলনের আগে বেশ কিছু কাজ থাকে। সেগুলো এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। তাই অক্টোবরে সম্মেলন করা যাবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। তবে এটাও ঠিক যে, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি এতোই শক্তিশালী যে, কেন্দ্র থেকে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় অক্টোবরেই সম্মেলন করা হবে, তাহলে সেটা সম্ভব।

দলীয় সূত্র জানায় , সম্মেলনের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে সাংগঠনিক সফরের জন্য দলের আটটি টিম গঠন করা হয়। ঈদুল ফিতরের আগেই দু’একটি জেলায় সফরেও যান নেতারা। কিন্তু রমজান মাসে সফর বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দেশে বন্যার পরিস্থিতির অবনতি এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। দলের সম্মেলনের আগে দেশ জুড়ে আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনার রেওয়াজ আছে। এতে নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং পুরনো সদস্যদের সদস্যপদ নবায়ন করা হয়। কিন্তু বন্যা ও ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে দেশের কোথাও সেভাবে এ কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।

প্রতিটি সম্মেলনের আগে তৃণমূল তথা ইউনিয়ন, থানা, জেলা পর্যায়ের সম্মেলন শেষ করে এরপর কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়। উল্লেখিত কারণেই এবার হাতে গোনো দু’একটি থানা ছাড়া এখনও কোথাও সম্মেলন আয়োজন করা যায়নি। তবে আগামী সেপ্টম্বরে কয়েকটি জেলায় সম্মেলন করার বিষয়ে আলোচনা করছেন দলটির নেতারা। এছাড়া কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী সংগঠনগুলোরও সম্মেলন করা হয়। আওয়ামী লীগের মেয়াদোত্তীর্ণ তিন সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন শ্রমিক লীগের মধ্যেও কোনও সম্মেলন প্রস্তুতি নেই।

এসব সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিবার সম্মেলনের আগে গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্র হালনাগাদ করা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু মার্চের শুরুতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে থমকে যায় গঠনতন্ত্র সংশোধন ও হালনাগাদের পদক্ষেপ। প্রায় আড়াইমাস সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে তিনি দেশে ফিরলেও ব্যস্ততায় এ সংক্রান্ত উদ্যোগ সম্ভব হয়নি।

আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন পূর্ব নির্ধারিত অক্টোবর মাসে আয়োজন করা থেকে দলটি সরে এসেছে, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে কাউন্সিলার তালিকা হালনাগাদ করা এবং বিভিন্ন প্রকাশনার প্রস্তুতি শুরু না হওয়ার মধ্য দিয়ে। অক্টোবরে সম্মেলন করতে হলে এসব কাজ এখনই শুরু করা জরুরী। সাম্প্রতিক বন্যা ও ডেঙ্গু সংকটে ওসব কাজে মনোযোগ দেওয়া দলের নেতাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সম্মেলন আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে গুছিয়ে আনা কঠিন। সবমিলিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সম্মেলন যে পিছিয়ে যাচ্ছে এমন আভাসই মিলে।

আওয়ামী লীগের নেতার অবশ্য সম্মেলনে পিছিয়ে দেয়া প্রসঙ্গে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে রাজি নন। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, যে কোনো রাজনৈতিক দলকে সাংগঠনিকভাব গতিশীল রাখতে নির্ধারিত সময়ে সম্মেলনের প্রয়োজন আছে। এটাকে অব্যাহত একটা প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। আমরাও এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। এরই মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। এখন দলীয় ফোরামে বিষয়টি নিয়ে আবার আলোচনা হবে। সেখানে যথাসময়ে সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত হতে পারে আবার যৌক্তিক কারণে অল্প কিছুদিন পিছিয়েও সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কাজেই এখনি চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না সম্মেলন পেছাচ্ছে।

আগামী অক্টোবরে আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে উৎসাহ ও উদ্দীপনার কমতি নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক পেরিয় আসার পর জেলা পর্যায়ের নেতারা আশা করছেন কেন্দ্রীয় মূল্যায়নের। নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভা গঠনে প্রধানমন্ত্রী নতুন মুখ ও তরুণদের প্রাধান্য দেওয়ায় দলীয়ভাবে মূল্যায়নের আশা তৃণমূল নেতাদের মধ্যে দৃঢ হয়েছে। জেলা পর্যায়ের অনেক নেতাই এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। পাশাপাশি দলের নানা পদে থাকা অনেক নেতা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে দুশ্চিতাতেও রয়েছেন। বিগত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করে অন্যপ্রার্থীকে যেসব নেতা সমর্থন দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দল এবার শক্ত অবস্থানে। নিজেদের পদ ধরে রাখতে এরই মধ্যে তারা দৌড়ঝাপ শুরু করে দিয়েচেন।

দলীয় সূত্র জানায়, দলের সভাপতির পরামর্শ অনুযায়ী এবার দলকে সরকার থেকে আলাদা করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের কাছে। এক্ষেত্রে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা হারাতে পারেন বর্তমান দলীয় পদ। মন্ত্রিপরিষদে নেই, এমন নেতাদের দিয়ে ঢেলে সাজানো হবে আওয়ামী লীগকে। যাদের সরকারে রাখা হয়নি, এবারের সম্মেলনে তাদের ভাগ্য খুলে যেতে পারে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের দেখা যাবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেমে এ নির্দেশনাই এসেছে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি পদ ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছের কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই জানিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কন্যার বিকল্প অন্য কেউ হতে পারেন না বলে মনে করেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমুলের নেতাকর্মীরা। শেখ হাসিনা নিজেও নেতাকর্মীদের এই মনোভাবের কথা জানেন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটির সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তি উদযাপন করবেন, দলের নেতাকর্মীদের এই আবেগে শেখ হাসিনা সাড়া দিবেন বলেই ধারণা আওয়ামী লীগের থিঙ্কট্যাংকের। দলের ভেতর-বাইরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সাধারণ সম্পাদক পদ। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী। এপদে ওবায়দুল কাদের অথবা তাঁর পরিবর্তে যেই আসুন না কেন, তিনি মন্ত্রিসভায় থাকবেন না- দলীয় এ পরিকল্পনার কথা বিভিন্ন সময় শোনা গেছে শীর্ষনেতাদের মুখ থেকে । সাধারণ সম্পাদক যেন দলের নেতাকর্মীদের জন্য সার্বক্ষণিক সময় দিতে পারেন—এই ভাবনা থেকেই পরিকল্পনা। চমক তৈরিতে আগ্রহী দলের সভাপতি শেখ হাসিনা হয়তো আগামী জাতীয় সম্মেলনে এটি বাস্তবায়ন করতে পারেন।

এছাড়াও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে থাকা ১০ নেতা বর্তমান মন্ত্রিসভায় রয়েছেন। আগামী জাতীয় সম্মেলনে তাদের জায়গায় ক্লিন ইমেজের নতুনমুখ আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অক্টোবরে সম্মেলন হোক বা না-হোক পদপ্রত্যাশী নেতার এরই মধ্যে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডি কার্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

Top