Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ রবি-উস-সানি ১৪৪১

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত : একই স্থানে কবর, শ্মশান ও সমাধি

 প্রকাশিত: ১০, জুলাই - ২০১৯ - ০২:২৮:১৪ PM - Revised Edition: 30th April 2019

 

স্বপন দেব, মৌলভীবাজার :: ‘ধর্ম যার যার-দেশ সবার’- এ কথাটির যথার্থই প্রমাণ মেলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী মাধবপুর ইউনিয়নের ন্যাশনাল টি কোম্পানীর মালিকানাধীন পাত্রখোলা চা বাগানে। এখানে একই স্থানে রয়েছে হিন্দুদের শ্মশান, মুসলিমদের কবরস্থান ও খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল। এ যেন ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরে একইস্থানে শ্মশান, কবর ও সমাধি হলেও তিন ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে থেকে স্ব স্ব ধর্ম পালন করে আসছে। ধর্ম পালন নিয়ে কখনও কোন বাকবিতণ্ডা পর্যন্ত হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি। তিন ধর্মের মানুষেরা শালীনতা বজায় রেখেই একইস্থানে দীর্ঘদিন ধরে মৃত মানুষের সৎকার করা হয়।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। যার অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশের নানা প্রান্তে। এমনই একটি দর্শনীয় স্থান কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী মাধবপুর ইউনিয়নের পাত্রখোলা চা বাগান। ১৮৭৫ সালে পাত্রখোলা চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে ৪.৯৪ একর (১৫ বিঘা) জমির উপর সকল ধর্মের লোকদের মৃত্যুর পর সৎকারের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হওয়ায় এখানকার মানুষজন খুশী। এখানে একই স্থানে হিন্দুদের শ্মশান, মুসলমানদের কবরস্থান ও খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল। এখানে তিন সম্প্রদায়ের মরদেহ নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ীই দাফন কিংবা সৎকার করা হয়ে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই সমাজে নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ বসবাস করলেও মৃত্যুর পর সাধারণত: তাদের জন্য থাকে আলাদা আলাদা সমাধির ব্যবস্থা। স্থানীয়রা বলছেন, সব ধর্মের মানুষের মাঝে সৌহার্দ্যরে দৃষ্টান্ত হিসেবেই এই সমাধিস্থলটি গড়ে উঠেছে।

দাফন/ দাহন ভূ পৃষ্টেই হয়? কিন্তু এতো কাছাকাছি হয়? এর রকম সম্প্রীতির শেষ সমাধি কি কেউ দেখেছেন? পাত্রখোলা চা বাগানের বিশাল জায়গা জুড়ে অবস্থিত এক জায়গায় তিন ধর্মের সমাধিস্থল। একটি স্থানেই ধর্ম-নির্বিশেষে দাফন কিংবা সৎকার হচ্ছে মুসলমান, হিন্দু এবং খ্রিষ্টানদের মরদেহ। বর্তমানে পাত্রখোলা চা বাগানে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার, হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ৮ জাজার ও খ্রিস্টানদের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এখানে ধর্ম নিয়ে নেই কোন হানাহানি ও মতবিরোধ। এসব ছাড়াই এখানে পারাস্পারিক সহযোগিতায় ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষরা। ফলে সম্প্রীতির এই স্থানটি দেখতে বিভিন্ন অঞ্চলের দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন এখানে।

আলাপকালে পাত্রখোলা চা বাগান সার্বজনীন মন্দিরের পুরোহিত রাজেশ প্রসাদ শর্মা, পাত্রখোলা জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল আজিজ ও পাত্রখোলা চা বাগান গীর্জার পরিচালক ধর্ম যাজক যোসেফ বিশ্বাস জানান, এখানে একই স্থানে হিন্দুদের শ্মশান, মুসলমানদের কবরস্থান ও খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল। এখানে তিন সম্প্রদায়ের মরদেহ নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ীই দাফন কিংবা সৎকার করা হয়ে থাকে। সুদীর্ঘকাল ধরে এখানের লোকদের মাঝে কোন হিংসা-বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ নেই। তারা জানান, একসাথেই যেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবনটা কাটাতে পারি। আমরা পাশাপাশি তিন ধর্মের মানুষ এক জায়গায়ই আছি। আমরা বিশ্বাস করি মৃত্যুর পরেও সবতো আমরা একসাথেই থাকব। মৃত্যুর পর তো আর কিছু থাকে না। এটা যখন প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয় তৎকালীন আমাদের তিন ধর্মের মুরব্বীরা ভেবেছিলেন কি দৃষ্টান্ত রাখা যায়? পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এমন একটা সৌহার্দ্য, এমন একটা সুসম্পর্ক রেখে যাবো, যাতে পরবর্তীতে এটা তাদের উপর ভাল সুফল বয়ে আনবে। ধর্ম যার যার উৎসব সবার। তিনটি ধর্মের লোকদের সম সুযোগ দিয়েই এখানে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করে মৃত ব্যক্তিদের সৎকার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। তাই ধর্ম পালনে কারও কোন সমস্যা হয় না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পাত্রখোলা চা বাগান ব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান মুন্না বলেন, ১৮৭৫ সালে পাত্রখোলা চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে ৪.৯৪ একর (১৫ বিঘা) জমির উপর সকল ধর্মের লোকদের মৃত্যুর পর সৎকারের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা হয়। এখানে একই জায়গায় ধর্ম-নির্বিশেষে দাফন কিংবা সৎকার হচ্ছে মুসলমান, হিন্দু এবং খ্রিষ্টানদের মরদেহ। সব ধর্মের মানুষের মাঝে দৃষ্টান্ত হিসেবেই এই সমাধিস্থলটি গড়ে উঠেছে। আমি মনে করি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে পাত্রখোলা চা বাগানে।

 

সৌজন্যে : সুরমা নিউজ।

এ বিভাগের​ আরও খবর


Top