Diclearation Shil No : 127/12
সিলেট, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬, ১৮ সফর​ ১৪৪১

শিরোনাম :

দূর হ অন্ধকার!- দেবব্রত চক্রবর্তী বিষুষ্ণ

 প্রকাশিত: ২১, জুন - ২০১৯ - ০৩:১৫:৫৫ PM - Revised Edition: 30th April 2019

দূর হ অন্ধকার!


অনেক স্পর্শকাতর মামলার বহু দুর্ধর্ষ আসামিকে গ্রেফতারে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কম দক্ষতা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি। কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারে তাদের সময়ক্ষেপণ ও ব্যর্থতা কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অভিযুক্তকে নানাভাবে সহায়তা দেওয়ার বিষয়গুলো পুলিশ বিভাগের কর্মতৎপরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সোনাগাজী থেকে ওসি মোয়াজ্জেমকে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করার পদক্ষেপটা ছিল তার জন্য অনেকটা নিরাপদ ব্যবস্থা করা। এরপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরই সাক্ষ্য দেওয়ার নাম করে তাকে আবার ঢাকায় আসার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়। অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কী করে ওসি মোয়াজ্জেম অন্য মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন? তিনি গত ঈদুল ফিতরের ছুটিও ভোগ করার অবকাশ পেয়েছিলেন! তাকে গ্রেফতার করার বিলম্বিত কারণ সম্পর্কে পুলিশের দায়িত্বশীল মহলসহ সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর এ ব্যাপারে যেসব ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ আমরা জানতে পারি, সেসবের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কেন পুলিশ বিভাগ এত মর্মস্পর্শী একটি ঘটনার অন্যতম একজন অভিযুক্ত, যিনি পুলিশ বিভাগেরই দায়িত্বশীল সদস্য, তাকে আইনের আওতায় নিতে দায়িত্ব পালনে এত গাফিলতি কিংবা উদাসীনতা কিংবা ব্যর্থতার (?) পরিচয় দিল? এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়টা কিন্তু পুলিশ বিভাগের সামনে রয়েই গেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ ব্যাপারে প্রথমে প্রশ্নবোধক কিছু কথা বললেও ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারের ব্যাপারে দৃঢ়তার কথাও বরাবরই জানিয়েছিলেন। আমরা তাদের আশ্বাসে বিশ্বাস রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারী ও নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ শিক্ষক নামের পাষণ্ড এস এম সিরাজ-উদ-দৌলার পালিত গুণ্ডা বাহিনীর ছায়াদানকারী ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করা হলো। তার দুস্কর্মের খতিয়ান ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে কম প্রকাশিত-প্রচারিত হয়নি। আমাদের পুলিশ বাহিনীতে এমন ওসি মোয়াজ্জেমের সংখ্যা কত- এ প্রশ্নও বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়ায়। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মর্মন্তুদ ঘটনার বড় দায় ওসি মোয়াজ্জেমের তা আরও আগেই স্পষ্ট হয়েছে এবং এর পেছনে অনৈতিক অনেক রকম সমীকরণও রয়েছে।

১৬ জুন রোববার ওসি মোয়াজ্জেম জামিন আবেদনের জন্য আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কৌশলে হাইকোর্ট এলাকায় যান। এরপর আদালত এলাকা থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্তুতি নিয়ে থাকা শাহবাগ থানা পুলিশ ওসি মোয়াজ্জেমকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। বিষয়টি আপাতত স্বস্তির এবং তাতে সংক্ষুব্ধ মানুষের ক্ষোভের কিছুটা প্রশমন ঘটেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আত্মগোপনে থাকা ওসি মোয়াজ্জেম কোথায় ছিলেন, তা অনুসন্ধানে ব্যর্থতা নাকি সদ্দিচ্ছার ঘাটতি দেখাল পুলিশ বিভাগ? গ্রেফতারের আগের দিন পর্যন্ত তিনি কুমিল্লায় এক পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় ছিলেন- এ কথা ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন (সূত্র :দেশ রূপান্তর, ১৭ জুন ২০১৯)। প্রশ্ন হচ্ছে- ওসি মোয়াজ্জেমের অবস্থান জানা সত্ত্বেও তাহলে কেন তাকে আরও আগে গ্রেফতার করা হয়নি? সময়ের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ও সত্তার প্রতীক নুসরাত জাহান রাফির ঘটনা এই সমাজকে যতটা নাড়া দিয়েছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিবাদ-ক্ষোভ-ঘৃণার যেভাবে সৃষ্টি হয়েছে, এরপর কি আমরা এখন আশা করতে পারি যে, এবার সত্যিকার অর্থেই শুরু হলো তিমির হননের সংগ্রাম?



নুসরাত জাহান রাফিকে কীভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা গং এবং তাদের অন্যতম সহযোগী ওসি মোয়াজ্জেম ও ঘটনা-পরবর্তী ফেনীর পুলিশ সুপারের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে নতুন করে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। সচেতন মানুষ মাত্রই এসব জানেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান বাস্তবতা কি আমাদের বক্রচিন্তার পথে নিয়ে যেতে বাধ্য করে না? আরেক করিতকর্মা কর্মকর্তা পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের কাণ্ডকীর্তিও সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন। দুস্কর্মকারী পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তাকে এখনও গ্রেফতার না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খানকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, 'ডিআইজি মিজানকে এখনও গ্রেফতার করছেন না কেন? সে কি দুদকের চেয়েও শক্তিশালী?' প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ এই প্রশ্ন তোলেন।

মিজান-মোয়াজ্জেম দু'জনই পুলিশের কর্মকর্তা। অর্থাৎ পচন ধরেছে মাথায় এবং তা ক্রমে সংক্রমিত হয়েছে নিচের স্তরে। এ দু'জনের কাহিনী পুলিশের ভাবমূর্তি পুনর্বার কতটা নষ্ট করল, এরও নতুন করে ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা পুলিশ সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের যেমন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধ পর্ব কিংবা স্বাধীন দেশেও পুলিশের অনেক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এও সত্য, মিজান-মোয়াজ্জেমদের মতো দুস্কর্মকারীরা পুলিশের অর্জনের বিসর্জনও ঘটিয়েছেন কিংবা ঘটাচ্ছেন। ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণসহ বহুবিধ দুস্কর্মে এমন মিজান-মোয়াজ্জেমদের সম্পৃক্ততার ঘটনা পুলিশের প্রতি জনআস্থা বিনষ্টের পথ রচনা করে।

যখন মিজান-মোয়াজ্জেম প্রসঙ্গে লিখছি, তখন আইজিপির একটি বক্তব্য মনে পড়ল। তিনি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন উদ্বোধন উপলক্ষে সেখানে বলেছেন, 'থানায় কেউ বেড়াতে আসে না, বিপদে পড়ে আসে। হয়রানির শিকার হলে কঠোর ব্যবস্থা।' এমন বক্তব্যের জন্য আইজিপি মহোদয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি প্রশ্ন রাখতে চাই-পুলিশের ক'জন সদস্য 'পুলিশ জনগণের বন্ধু' এই কথাটি আমলে রেখে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠ? এই আপ্তবাক্যের সঙ্গে বিদ্যমান বাস্তবতার অমিলটা নানা ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আমরা পুলিশের ওপর আস্থা রাখতে চাই। পুলিশ জনগণের বন্ধু- এই বাক্যের যথার্থতা বাস্তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখতে চাই। পুলিশে সংস্কার প্রয়োজন- এ কথা ইতিমধ্যে বহুবার নানা মহল থেকে উঠেছে। কিন্তু এই জরুরি কাজটি হচ্ছে না। পুলিশের অনেক সদস্য দুস্কর্মে জড়িয়ে গেছেন- এটা যেমন সত্য, আবার এও প্রমাণিত যে, পুলিশের বহু কর্মকর্তা-সদস্য নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করেছেন, করছেন এবং জীবনবাজি রেখে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। একজন মিজান কিংবা মোয়াজ্জেমকে দিয়ে আমরা গোটা পুলিশ বাহিনীর মূল্যায়ন করব না। কিন্তু একই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখা দরকার, এত বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আর উদাসীন থাকাও সমীচীন হবে না।

সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানুষের আস্থা অর্জন। আর এ জন্য পুলিশকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তাদের যেমন পোলাইট হওয়া অত্যন্ত জরুরি, তেমনি জরুরি ওবিডিয়েন্ট থাকাও। লয়াল, ইন্টেলিজেন্ট, কারেজাস, এফিসিয়েন্টও হতে হয়। ইংরেজি পুলিশ শব্দটির প্রতিটি অক্ষরের এ হলো আলাদা অর্থ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশ বাহিনীর ক'জন এই শব্দগুলো ও তাৎপর্যের প্রতি সুবিচার করতে পারছেন? আমাদের খ্যাতিমান কবি গুণদার (নির্মলেন্দু গুণ) 'দূর হ দুঃশাসন' নামে কবিতাটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জনের পর অনেকেই ব্যঙ্গরসে এ নিয়ে নানা পরিস্থিতিতে আলোচনা করতেন। এই লেখাটি শেষ করতে গিয়ে সেই কবিতার নামটি স্মরণে এলো। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের পুলিশ বাহিনীর দুস্কর্মকারীদের কৃতকর্ম পর্যালোচনা করে বলতে হচ্ছে- দূর হ অন্ধকার। এই অন্ধকার দূর করতেই হবে দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে ও পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা পুষ্ট করতেই। এভাবে চলতে পারে না, চলা মোটেই সমীচীনও নয়।

সৌজন্যে : সমকাল।

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ

Top